আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অনেকেই স্বাবলম্বী

অনলাইনে কাজ করে বিদেশী মুদ্রা আয় করতে আউটসোসিংয়ে যুক্ত হচ্ছে অনেক তরুণ। আগে এই পেশায় শিক্ষিত বেকার তরুণদের খুব একটা পদচারনা ছিল না। কিন্তু সরকারের নানা উদ্যোগের ফলে এখন অনেকেই অনলাইনে ঘরে বসে বিদেশী সমস্যার সমাধান দিয়ে ভালো পরিমাণ অর্থ আয় করছেন। আবার আগে যারা কাজ করতো তাদের মধ্যে সফল ছিল মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন। কিন্তু তথ্য প্রযুক্তি বিভাগের লার্নিং অ্যান্ড আর্নিংসহ নানা প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ পেয়ে আউটসোর্সিংয়ে সফলদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই। বিশেষ করে গ্রামীণ শিক্ষিত তরুণরা এখন স্বাবলম্বী হচ্ছে, আত্মবিশ্বাস অর্জন করছে। সরকারী-বেসরকারী পর্যায়ে প্রতিবছর অসংখ্য তরুণকে দেওয়া হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং এ বিভিন্ন প্রণোদনা। তাদের মাধ্যমে অনুপ্রাণিতও হচ্ছেন অনেকে।

তাদের একজন রাজবাড়ির কলেজ শিক্ষার্থী মোস্তফা চৌধুরী তামিম। ছোটবেলা থেকে প্রযুক্তির প্রতি প্রেম থেকে ফ্রিল্যান্সার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। তথ্য প্রযুক্তি বিভাগের লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রকল্পের প্রশিক্ষণ গ্রহন করে তিনি এখন পুরোদস্তর ফ্রিল্যান্সার। নিজের বেকারত্ব ঘুচিয়ে সংসারে সচ্ছলতা এনে দিয়েছে তাঁর আউটসোর্সিং দক্ষতা। প্রশিক্ষণ মানুষের সামর্থ বাড়িয়ে দেয় নিজের জীবনের এমন উপলব্ধি বর্ণনা করে মোস্তফা চৌধুরী তামিম বলেন, ‘প্রশিক্ষণ গ্রহনের পর এখন আমি সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন, এফিলিয়েট মার্কেটিং এবং গুগল অ্যান্ডসেন্স নিয়ে কাজ করছি। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে আমি প্রথম ৩০ ডলার আয় করেছিলাম সেশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং থেকে। এখন পর্যন্ত ২০০ ডলার আয় করেছি। তথ্য প্রযুক্তি খাত খুব দ্রুত বিকশিত হচ্ছে এবং আশা করছি সামনে আরো অনেক সুযোগ আসবে। আমর স্বপ্ন দক্ষ ফ্রিল্যান্সারদের নিয়ে একটি কমিউনিটি গড়ে তুলতে চায়।’

ঢাকার মহাখালি ব্র্যাক ইন সেন্টারে শুক্রবার তথ্য প্রযুক্তি বিভাগের লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রকল্পের উদ্যোগে ফ্রিল্যান্সারদের মিলনমেলায় নিজের সাফল্যের অভিজ্ঞতার কথা এভাবেই তুলে ধরলেন তামিমের মতো আরো অনেকেই। বৃহত্তর ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে সফল ১০০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ‘সাকসেসফুল ট্রেইনি মিট আপ’ শীর্ষক কর্মশালা আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য প্রযুক্তি বিভাগের সচিব সুবীর কিশোর চৌধুরী। কর্মশালায় আরো বক্তব্য দেন লানিং অ্যান্ড আর্নিংয়ের প্রকল্প পরিচালক পরিচালক মির্জা আলী আশরাফ, ডিজিকনের প্রধান নির্বাহী ওয়াহিদ শরিফ  বেইজ টেকনলজিসের এর সিওও রিয়াজ ইসলাম, এবং এমসিসি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী এস এম আশ্রাফ আবির সহ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তারা।

কর্মশলায় অংশগ্রহনকারী সবাই ৫০ দিনের লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ব্যাচে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার পর, আউটসোসিংয়ের মাধ্যমে অনলাইনে আয় করে ধারাবাহিক সাফল্য বজায় রেখেছে । কর্মশালায় গ্রাফিক্স ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন ও ডিজিটাল মার্কেটিং বিষয়ক ফ্রিলান্সারদের বিভিন্ন মার্কেটপ্লেস এর মাধ্যমে বিদেশে কাজ করে অর্থ উপার্জনের নিজেদের অভিজ্ঞতা ও প্রতিকূলতা জয় করার কথা তুলে ধরেন বিভিন্ন জেলা থেকে আসা প্রশিক্ষণ গ্রহনকারীরা। অনুষ্ঠানে সফল ফ্রিল্যান্সাররা একে একে নিজের গল্প তুলে ধরেন।

ইন্টারনেটভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিং করে অর্থ উপার্জন করছেন মাদারিপুরে লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রকল্পের শিক্ষার্থী শামসুর নাহার সাথী। তিনি বলেন, ‘ঘরে বসে নারীদের  ঝুঁকিহীন কাজ হলো ফ্রিল্যান্সিং। লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিয়ে এই প্রকল্প থেকে আমরা বেকাররা ঘরে বসে কিভাবে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করে বিদেশী মুদ্রা অর্জন করতে পারবো তা শিখছি। আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই একটি ল্যাপটপ দিয়ে আমরা ৪০ দিনের মাথায় প্রথম ৫ ডলার আয় করি। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে আমি আরো আয় করমে । একজন ফ্রিল্যান্সিং করে মাসে ঠিক কত টাকা আয় করতে পারেন, তা নির্ভর করে তার দক্ষতার উপর। সাধারণত প্রতি মাসে কাজের ধরনভেদে ৩০ হাজার থেকে চার-পাঁচ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। আমি সেই লক্ষেই এগিয়ে যাচ্ছি’

কর্মশালায় নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন মাদারিপুরের শিক্ষার্থী ইব্রাহিম হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘একদিন আমাদের কলেজে একটি সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। সেখানে দেখলাম আইসিটি ডিভিশনের পক্ষ থেকে একটি প্রশিক্ষণ হবে ওয়েব, গ্রাফিক্স ডিজাইন এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের ওপর। কিন্তু এই কাজগুলো করতে যে গতির ইন্টারনেট প্রয়োজন আমাদের এখানে তা পাওয়া যায় না আবার তা আমাদের জন্য খুবই ব্যয়বহুল। মা বাবার অনেক কথা শুনতে হয়েছে এটা দিয়ে ভবিষ্যতে কিছু হবে কি না। কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি এখানেই আমার ভবিষ্যত লুকিয়ে আছে। যখন আমি দেখি অ্যাডসেন্সে আমার ৫ ডলার জমা হয়েছে তখন আমার কাজের উৎসাহ অনেক বেড়ে যায়। এ পর্যন্ত ৪০০ ডলার আয় করেছি।

শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিয়ে তথ্য প্রযুক্তি বিভাগের সচিব সুবীর কিশোর চৌধুরী বলেন, ‘স্বাধীনভাবে উপার্জন করে ভালো থাকার জন্য ফ্রিল্যান্সিং সবচেয়ে ভালো মাধ্যম। তোমরা বিদেশী মুদ্রা আয় করে ভালো থাকো, দেশকে ভালো রাখো। তথ্য প্রযুক্তি বিভাগ তোমাদের পাশে থাকবে। তথ্য প্রযুক্তি বিভাগ শুধু প্রশিক্ষণ দিয়েই নয়, মেনটরিংসহ প্রয়োজনীয় সবরকমের সহায়তা দেবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

কর্মশালায় জানানো হয়, শেখার সঙ্গে সঙ্গে কিভাবে উপার্জন করা যায় এই ধারণাকে তরুণদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে এই লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রকল্প। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ফ্রিল্যান্সারদের দক্ষতাকে আরও বিকশিত করতে এই প্রকল্প শুরু করে আইসিটি বিভাগ। প্রকল্পের উদ্দেশ্য অনলাইন আউটসোর্সিং কাজে তরুণদের সম্পৃক্ত করে কর্মসংস্থান বাড়ানো।

লার্নিং অ্যান্ড প্রকল্পের পরিচালক মির্জা আলী আশরাফ বলেন, ‘মানবসম্পদ উন্নয়ন হল ডিজিটাল বাংলাদেশের মূল ভিত্তি। এ লক্ষ্য অর্জনে আমরা তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছি। লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং  ডেভেলপমেন্ট প্রল্পের আওতায় ৫৫ হাজার জনকে যথাক্রমে বেসিক আইসিটি, টপ-আপ, ফিউচার লিডার এবং ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ প্রদানের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ‘তথ্য প্রযুক্তি বিভাগের লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং উদ্যোগের সুফল পৌছে গেছে তৃণমূল পর্যন্ত। সেখানে অনেকেই প্রশিক্ষণ পেয়ে স্বাবলম্বি হচ্ছেন। মানুষের সাফল্যের জন্য প্রয়োজন হয় সুযোগের। মানুষকে যদি সুযোগ তৈরি করে দেওয়া যায় তারা সাফল্যের সিঁড়িবেয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। আইসিটি ভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন ধরণের প্রকল্প ও কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে বিকশিত করার জন্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তুলতে লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রকল্প বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।’

ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে দেশের বেকারত্ব মুছে ফেলা সম্ভব উল্লেখ করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ‘একটু মেধা খাটালেই ঘরে বসে আয়-রোজগার করা সম্ভব।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, অর্থ উপার্জনের জন্য মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে যায়। অনেকে বিদেশে কায়িক শ্রম দিয়ে দেশে টাকা পাঠায়। অতিরিক্ত শারীরিক শ্রম বিসর্জন দিয়ে এখন আর আয় করতে হবে না। মেধা দিয়ে আয়ের পথ সুগম করতেই লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার।

প্রযুক্তিকথন/ডেস্ক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *