ডিজিটাল প্রতারণায় কোটিপতি ইসহাক আলী মনি

নিজেকে কখনও এনজিও কখনো বা গ্রুপ অব প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার দাবি করেন ইসহাক আলী মনি। শুধু তাই নয় কখনো কখনো তিনি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মালিকও দাবি করেন। ইসহাক আলী মনি’র ব্যবসায়ী ফাঁদে পড়েছেন দেশের অনেক প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান। যারা তার প্রতারণার ফাঁদে পড়ে এখন স্বর্বশান্ত। মাদার আপল্যান্ড কিপ ট্রায়াল ইনিশিয়েটিভ সোসাইটি; সংক্ষেপে মুক্তিস। একটি এনজিও’র নাম। এই এনজিওকেই প্রতারণার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ইসহাক আলী মনি অভিনব পদ্ধতিতে হাতিয়ে নিয়েছেন মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ফার্নিচারসহ কোটি টাকার পণ্য।

ইসহাক আলী মনি’র বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মামলা হলেও বারবারই আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তার দ্বারা প্রতারণার শিকার বাংলাদেশের জনপ্রিয় স্মার্টফোন ব্র্যান্ড ওকাপিয়ার পরিবেশক ওকামায়া লিমিটেড ও অনলাইন শপ পিকাবো ডট কম।

এ বিষয়ে ওকামায়া প্রযুক্তিকথনকে জানায়, ২০১৬ সালের ১৬ মার্চ মুক্তিসের নামে তাদের কাছ থেকে ওকাপিয়া ব্র্যান্ডের ৩ হাজার ৫’শ ৫৫টি হ্যান্ডসেট কেনেন ইসহাক আলী মনি। বিনিময়ে ১ কোটি ৩ লাখ ২৩ হাজার ২৫০ টাকার প্রিমিয়ার ব্যংকের (শ্যামলী শাখা) একটি চেক দেন। ২৪ মার্চ মুক্তিসকে পণ্য ডেলিভারি দেয়ার পর তাদের দেয়া চেক নিয়ে ওকামায়া লিমিটেডের অ্যাকাউন্টে (শাহজালাল ব্যাংক, উত্তরা শাখা) গেলে চেকের বিনিময়ে মুক্তিসের অ্যাকাউণ্টে পর্যাপ্ত টাকা নেই বলে জানায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

ওকাপিয়া মোবাইলের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার অ্যাডভোকেট মাসুদ প্রযুক্তিকথনকে জানান, অ্যাকাউণ্টে পর্যাপ্ত টাকা নেই জেনে ওকামায়ার পক্ষ থেকে মুক্তিসের মহাখালী অফিসে গিরে দেখা যায় প্রতিষ্ঠানটি ওকাপিয়ার পণ্যগুলো নিয়ে তাদের অফিস গুটিয়ে পালানোর চেষ্ঠা করছে। সেসময় মুক্তিসের কর্ণধার ইসহাক আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কোনো টাকা দেবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়। উল্টো ওকামায়ার কর্মীদের গুম করে ফেলারও হুমকি দেয়।

মাসুদ আরো জানান, এরপর ২৬ মার্চ ওকামায়া কর্তৃপক্ষ ইসহাক আলী মনিসহ মুক্তিস কর্মকর্তাদের আসামী করে রাজধানীর কাফরুল থানায় একটি প্রতারণা মামলা দায়ের করে। একইসঙ্গে উত্তরা পূর্ব ও পশ্চিম থানায় দুটি সাধারণ ডায়েরিও করে তারা। গ্রেফতারের পর রিমান্ডে আসামীরা প্রতারণার কথা স্বীকার করে। এত বড় একটা প্রতারণার শিকার হয়ে ওকাপিয়া মোবাইল স্বর্বশান্ত হয়ে গেছে।

শুধু মুক্তিস কিংবা মাদার আপল্যান্ডই নয়, প্রতারক ইসহাক আলী মনি নিজেকে কখনো মাল্টি ইন্টারন্যাশনাল কখনোবা সুফিয়া গ্রুপ নামক ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার বলেও দাবি করেন। ওকাপিয়া মোবাইলের পাশাপাশি ইসহাক আলী মনি’র চেক প্রতারনার শিকার হয়েছে জনপ্রিয় অনলাইন শপ পিকাবোসহ বেশকিছু স্বনামধন্য ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান।

অনলাইন শপ পিকাবো’র অভিযোগ, ৯ আগস্ট মাদার আপল্যান্ডের নামে তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হ্যান্ডসেট কেনেন ইসহাক আলী মনি। বিনিময়ে পিকাবোকে দেয়া হয় ২৮ লাখ ১৫ হাজার ২০০ টাকার প্রিমিয়ার ব্যংকের (সাভার শাখা) একটি চেক। এ বছরের ১৩ আগস্ট মাদার আপল্যান্ডকে পণ্য বুঝিয়ে দেয়ার পর ১৬ আগস্ট তাদের চেক নিয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকের গুলশান শাখায় গেলে চেকের অ্যাকাউণ্টে পর্যাপ্ত টাকা নেই বলে জানায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

পিকাবো জানায় অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকার বিষয়টি মাদার আপল্যান্ডকে জানালে তারা কয়েক দফায় চেকের মেয়াদ ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করে। সর্বশেষ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ চেকটি চূড়ান্তভাবে ডিজঅনার করে এবং মাদার আপল্যান্ডের নামে ঐ অ্যাকাউন্টের লেনদেনের বিবরণও দেখায়। দেখা গেছে, এর আগেও অনেক প্রতিষ্ঠানের চেক ডিজঅনার হয়েছে।

পরে গত ৫ অক্টোবর পিকাবো কর্তৃপক্ষ সরাসরি মাদার আপল্যান্ডের সাভারের অফিসে হাজির হলে ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানটি পিকাবোর কাছ থেকে কোনো পণ্যই কেনেনি বলে জানায়। এক পর্যায়ে পিকাবোর কর্মকর্তাদের হুমকি-ধামকি দেয়। এরপর ১৫ অক্টোবর মাদার আপল্যান্ডের কর্মকর্তাদের আসামী করে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় একটি প্রতারণা মামলা দায়ের করে প্রতিষ্ঠানটি।

মামলার তদন্তভার পেয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ মুক্তিসের প্রধান ইসহাক আলী মনিসহ ৪ আসামীকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে আসামীরা পিকাবো ডট কমের পাশাপাশি আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একই ধরনের প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকার পণ্য হাতিয়ে নেয়ার কথা স্বীকার করে মনি।

এ নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় পুলিশ। তবে এরপরও এক পর্যায়ে মাদার আপল্যান্ডের কর্ণধার ও মামলার প্রধান আসামী ইসহাক আলী মনি জামিনে বেরিয়ে আসেন।

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে পিকাবো ডট কমের লিগ্যাল, প্রকিউরমেন্ট অ্যাণ্ড অ্যাডমিন বিভাগের কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোস্তফা প্রযুক্তিকথনকে জানান. পিকাবো কর্তৃপক্ষের মামলায় গ্রেফতারের পর বিভিন্ন প্রভাব খটিয়ে এবং মোটা অঙ্কের অর্থ ঘুষ দিয়ে জেল থেকে বের হন প্রতারক ইসহাক আলী মনি। এরপর তাকে অন্যান্য মামলায় গ্রেফতার করতে গেলেও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাপে গ্রেফতার করা যায়নি।

বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা যায়, ওকাপিয়া, পিকাবোসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতারণা করে হাতিয়ে নেয়া মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, ফার্নিচারসহ অন্যান্য মালপত্র নিয়ে সাভার ও রাজধানীর বনানীতে নতুন অফিস খুলেছেন ইসহাক আলী মনি।

প্রযুক্তিকথন//তুষার/

Related posts

Leave a Comment