তথ্য অধিকার আইনের ইতিকথা

তথ্য অধিকার আইন সাধারণত জনগণের তথ্য পাওয়ার স্বাধীনতা সংক্রান্ত আইন নামে পরিচিত। একে বলা হয় উন্মুক্ত তথ্য। যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের আইন ‘আলোকিত আইন’ নামে পরিচিত। কিছু কিছু দেশে এ আইনের শিরোনাম হলো ‘তথ্য স্বাধীনতা আইন’।এ ধরনের আইন বিভিন্ন শিরোনামে পৃথিবীর ৭০টি দেশে প্রচলিত রয়েছে ।

১৭৬৬ সালে প্রথম সুইডেনে এ ধরনের আইন প্রবর্তিত হয় যা ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আইন’ নামে পরিচিত। এ আইনটিইতথ্য অধিকার সংক্রান্ত প্রাচীনতম আইন বলে সাধারণভাবে স্বীকৃত। একাধিক অঙ্গরাজ্য নিয়ে গঠিত উন্নত রাষ্ট্রে ঐ সমস্ত অঙ্গরাজ্যে কেন্দ্রীয় আইন ব্যতীত একই ধরনের পৃথক আইনও প্রচলিত রয়েছে।

ধারণাগত ও ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে তথ্য অধিকার আইন মূলত একটি আইনি প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারি তথ্য জনগণকে প্রদান করতে হয়। অনেক দেশেই তথ্য প্রাপ্তির অধিকার সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। তবে সুনির্দিষ্ট আইনের অভাবে জনগণ সহজে তথ্য লাভ করতে সক্ষম নয়। কোনো নাগরিক বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যে সংস্থাকে তথ্য দেওয়ার অনুরোধ জানায়, চাহিত তথ্য প্রদানের বাধ্যবাধকতা সে প্রতিষ্ঠানের উপরই বর্তায়, অন্য কারো উপর নয়। অধিকাংশ দেশে আইনের বিধানে এ বিষয়টি স্বীকৃত।

যদি সংশ্লিষ্ট সংস্থা তথ্য প্রদানে অপরাগতা প্রকাশ করে তাহলে এর জন্য উপযুক্ত কারণ জানাতে হয়।সার্কভুক্ত বেশিরভাগ রাষ্ট্রই তথ্য অধিকার আইন প্রবর্তন করেছে। ২০০২ সালে পাকিস্তান তথ্য স্বাধীনতা অধ্যাদেশ বলবৎ করে। ভারতে এ ধরনের আইন ২০০৫ সালে গৃহীত হয় যা ‘তথ্য অধিকার আইন’ নামে পরিচিত। এ সংক্রান্ত ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইন দুটি কারণে অনুপ্রানিত হয়। এক, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক এ সংক্রান্ত একাধিক নির্দেশনা। দুই, বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গৃহীত তথ্য অধিকার আইনের প্রচলন। উদাহরণস্বরূপ মহারাষ্ট্র, গোয়া, কর্নাটক এবং দিল্লির নাম উল্লেখ করা যায়।

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট এই মর্মে অভিমত পোষণ করেছে যে, সংবিধানের আওতায় বাকস্বাধীনতা এবং জীবনের নিরাপত্তা সংক্রান্ত অধিকার হচ্ছে জনগণের মৌলিক অধিকার এবং তথ্য প্রাপ্তির অধিকার এর মধ্যে নিহিত রয়েছে।বাংলাদেশের সংবিধানেও অনুরূপ অধিকারের স্বীকৃতি বিদ্যমান।বতবে সংবিধানে এ কথাও বলা আছে যে, এ ধরনের মৌলিক অধিকারের উপর যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপ করা যায়। ২০০০ সাল থেকে তথ্য অধিকার আইন প্রচলন করার জন্য নাগরিক সমাজ ও মিডিয়া ক্রমাগত দাবি উত্থাপন করার কারণে বাংলাদেশে এ আইন প্রচলিত হয়। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসের ২০ তারিখে এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ প্রজ্ঞাপন গেজেটের মাধ্যমে জারী করে (অধ্যাদেশ নং ৫০, ২০০৮)। বাকস্বাধীনতা,চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তথ্য প্রাপ্তির অধিকারই এ অধ্যাদেশের প্রারম্ভিক অংশে স্বীকৃতি লাভ করেছে।

এ ছাড়া ঐ অংশে এ কথাও বলা হয়েছে যে, জনগণকে অধিকতর ক্ষমতার অধিকারী করার জন্য এ আইন জরুরী। অধ্যাদেশের ৩৬টি  ধারা প্রতিটি এক একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত। এ ধারাসমূহ আটটি অংশ নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে রয়েছে (১)সংজ্ঞা; (২) তথ্য অধিকার সংরক্ষণ, তথ্যপ্রাপ্তি; তবে ২০টি বিষয়ের তথ্য প্রকাশে বাধা আরোপ করা হয়েছে; (৩) তথ্য প্রদানের জন্য নির্দিষ্ট কর্মকর্তা নিয়োগ; (৪) একজন প্রধান তথ্য কমিশনারসহ দুইজন কমিশনার নিয়ে তথ্য কমিশন গঠন, এদের ক্ষমতা ও কার্যাবলি; (৫) কমিশনের তহবিল, বাজেট, আর্থিক স্বাধীনতা, হিসাব নিরীক্ষা; (৬) কমিশনের কর্মকর্তা ও কর্মচারী; (৭) তথ্য না প্রদানের অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং (৮) বিবিধ।

জাতীয় সংসদ কিছু সংশোধনীসহ এ সংক্রান্ত বিল ২০০৯ সালের ৩০ মার্চ অনুমোদন করে। এ আইন ইতিপূর্বে জারীকৃত অধ্যাদেশও  রহিত করে।  তবে অধ্যাদেশের অধীনে কৃত সকল কর্মকে বৈধতা প্রদান করে।এ আইনের বিধানে একজন প্রধান তথ্য কমিশনার (সিআইসি) এবং অন্য দু’জন কমিশনার নিয়োগ করা যায়। এর মধ্যে অন্তত একজন মহিলা হবেন। সিআইসি কমিশনের প্রধান নির্বাহী হবেন।

সিআইসি ও অন্য দু’জন কমিশনার রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করবেন। তবে এ সংক্রান্ত বাছাই কমিটির সুপারিশ বিবেচনা করে রাষ্ট্রপতি এ নিয়োগ প্রদান করবেন। তবে বাছাই কমিটি প্রতি পদের জন্য দু’জন ব্যক্তিকে মনোনয়ন প্রদান করবেন। সংশ্লিষ্ট বাছাই কমিটির সভাপতি হবেন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগের একজন বিচারপতি। কমিটির অন্য চার জন সদস্য হবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সরকারি ও বিরোধী দলের দু’জন সাংসদ (যদি সংসদ কার্যকর থাকে), সম্পাদক হওয়ার যোগ্য একজন সাংবাদিক এবং মিডিয়ার সাথে সম্পৃক্ত একজন বিশিষ্ট নাগরিক।

কমিশনে নিযুক্তির জন্য সর্বোচ্চ বয়োসীমা সাতষট্টি বছর। নিযুক্তির মেয়াদ সর্বোচ্চপাঁচ বছর অথবা সাতষট্টিবছর বয়স, যা আগে হবে। সিআইসি ও অন্য কমিশনারদ্বয় মেয়াদান্তে পুনরায় নিযুক্তি লাভের যোগ্য হবেন। কোনো কর্মরত কমিশনারও  সিআইসি পদে নিযুক্তি লাভের যোগ্য হবেন। আইন, বিচার, সাংবাদিকতা, শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, তথ্য, সমাজকল্যাণ, ব্যবস্থাপনা বা জনপ্রশাসনে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানসম্পন্ন ব্যাক্তিদের এসব পদে নিয়োগ দিতে হবে।

এদের সংশ্লিষ্ট পদ থেকে অপসারণের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণ সংক্রান্ত বিধান অনুসরণীয়। তবে আইনের দ্বারা নির্ধারিত কয়েকটি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি এ বিধান অনুসরণ করতে বাধ্য নন।সিআইসি ও কমিশনারদের পদমর্যাদা, পারিশ্রমিক, অন্যান্য ভাতা সুবিধাদি সরকার নির্ধারণ করবে।কমিশনের কার্যপরিধি এবং ক্ষমতা আইনে নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রদত্তকার্যাবলী নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কমিশনযেকোনোব্যক্তিকেহাজির হতে বাধ্যকরাসহকোনোতথ্যবাদলিলসংগ্রহ করতেক্ষমতাবান।

কমিশনের নিজস্ব তহবিল গঠন করার দুইটি উৎস হলো সরকারি অনুদান এবং সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে অন্য প্রতিষ্ঠানের অনুদান। কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতাও রয়েছে। বাজেটে নির্ধারিত খাতের অর্থ সরকারের পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে ব্যয় করতে কমিশন ক্ষমতাবান। সকল ব্যয় কম্পট্রোলার এবং অডিটর জেনারেল কর্তৃক নীরিক্ষাযোগ্য। কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা কোনোভাবে কম্পট্রোলার এবং অডিটর জেনারেলের অধিকার ক্ষুন্ন করবে না। আইনের কোনো ধারা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ভংগ করলে তার উপর জরিমানামূলক শাস্তি প্রদান করা হবে।

সরকারের আটটি গোয়েন্দা সংস্থাকে তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দান করা হয়েছে। এ ধরনের অব্যাহতি মূলত জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থের সাথে সম্পৃক্ত। তবে যে সকল বিষয়ে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে তার তালিকা দীর্ঘ। এর সংখ্যা তেইশটি যা আইনে নির্ধারিত করা হয়েছে। তবে আইনে এ বিধানও রয়েছে যে (ক) কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত যদি মন্ত্রিপরিষদ অথবা ক্ষেত্রমত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ গ্রহণ করে তাহলে তথ্য প্রকাশ সাময়িকভাবে স্থগিত করার বিষয়ে এর কারণসহ কমিশনকে অবহিত করতে হবে এবং (খ) এ ক্ষেত্রে কমিশনের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *